
যেভাবে আমাদের অধঃপতন হলো...-হাজার বছর ধরে দুনিয়াতে নেতৃত্বের আসনে ছিলাম আমরা। জ্ঞান বিজ্ঞান প্রযুক্তি শিল্প বাণিজ্য সহ সকল ক্ষেত্রে আমাদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। তখন ইউরোপীয়রা আমাদের দেখে ইর্ষান্বিত হত, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জ্ঞান বিজ্ঞান শিখতে আসত। আমাদের সংস্পর্শে আসার আগে বনের জন্তু জানোয়ারের ন্যায় ছিল তাদের জীবন। আমরাই তাদেরকে ভদ্রতা সভ্যতা ও জ্ঞান বিজ্ঞান শিখিয়েছি। বিশ্বজুড়ে তখন আমাদের বীরত্বের গল্পগাঁথা রূপকথার গল্পের ন্যায় ছড়িয়ে পড়েছিল। আমাদের নাম শুনলেই শত্রুরা থর থর করে কাঁপতে শুরু করত।
এরপর ধীরে ধীরে আমাদের মাঝে অধঃপতন আসতে শুরু করল, কাফেরদের বিরুদ্ধে কঠোরতা ভুলে নিজেদের মধ্যেই মারামারি শুরু করলাম। সাহসিকতা, বীরত্ব, ইমান ও জিহাদের পথ ভুলে বেছে নিলাম দুনিয়ার আরাম আয়েশ। কুফফারগোষ্ঠী আমাদের এই দূর্বলতা বুঝতে পেরে শক্তি সঞ্চয় করতে লাগল। যারা একসময় আমাদের ছায়া দেখেও থর থর করে কাঁপত তারাই আমাদেরকেই চোখ রাঙাতে লাগল। ধীরে ধীরে আমাদের সীমানার দিকেও হাত বাড়ানোর সাহস করতে লাগল।
এরপর শুরু হল আক্রমণ। তাদের আক্রমণে প্রথমে হারালাম ফিলিস্তিন (১০৯৯ খ্রি.) ও বাগদাদ(১২৫৮ খ্রি.), পরে অবশ্য আবার ফিরে পেয়েছিলাম, এরপর হারালাম পর্তুগাল ও স্পেন(১২৪৯, ১৪৯২ খ্রি.), যা এখনো আমরা ফিরিয়ে আনতে পারিনি। এত বড় বড় ধাক্কা সত্ত্বেও আমরা তখনো একেবারে নখদন্তহীন হয়ে যাইনি, দুনিয়ার বিভিন্নস্থানে আমাদের আধিপত্য ছিল। উসমানী খিলাফত, মামলুক সালতানাত, ব্রুনেই সালতানাত সহ ছোট বড় অনেক সালতানাত তখনো বেশ দাপটের সাথে ইসলামী আইন দিয়ে নিজ নিজ রাজ্য পরিচালনা করছিল। পরবর্তীতেও আরো অনেকগুলো শক্তিশালী সালতানাত গড়ে উঠেছিল। যদিও একাধিক সালতানাত হওয়া কাম্য ছিলনা, সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধ হওয়াটাই ইসলামের তাকাজা ছিল, কিন্তু তবু অন্তত শরিয়াহ শাসন ছিল। -কয়েক দশক ধরে ইউরোপের লোকেরা ধর্মীয় ও অন্যন্য বিষয় নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, যাতে অন্তত ৭/৮ মিলিয়ন মানুষ নিহত হয়। দীর্ঘ যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে এক পর্যায়ে তারা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। ১৬৪৮ সালে সবাই মিলে একটা চুক্তি করে, যেটি ওয়েস্টফেলিয়া নামে পরিচিত।
এই চুক্তির মূল কথা ছিল- ‘এখন থেকে তারা আর নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে শক্তি ক্ষয় করবেনা, অন্যদের দেশ দখল করে উপনিবেশ কায়েম করবে’। এরপর তারা ধোঁকা ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে মুসলিম ভূখন্ডগুলোতে। কিন্তু আমরা তখন একতার বদলে বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়লাম। আমাদের নেতৃত্বের বড় একটা অংশ তখন যুদ্ধ ও বীরত্বের পরিবর্তে ভীরুতা ও গাদ্দারীকে বেছে নিল। ইউরোপ যখন জ্ঞান বিজ্ঞানে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন আমাদের জ্ঞানী সমাজ নতুন নতুন জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পরিবর্তে অনেক অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে সময় ব্যায় করল। ফলে ১৭শ শতক থেকে ২০শ শতকের মাঝে আমাদের প্রায় সব ভূখণ্ডই বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দখলে চলে যায়।
আমাদের পতনের কারণে ইউরোপীয়রা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, জ্ঞান বিজ্ঞান প্রযুক্তি শিল্প বাণিজ্য সহ প্রায় সকল ক্ষেত্রে তাদের আধিপত্য কায়েম হয়। জুলুম অত্যাচার করে তারা আমাদের সম্পদগুলো ছিনিয়ে নেয়। এরমাধ্যমে তাদের দেশগুলো সম্পদে ভরে যায়। অপরদিকে আমাদের দেশগুলো অল্প সময়ের ব্যবধানে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়, অনাহার দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার কারণে মেধাশূন্য অশিক্ষিত জাতি গড়ে ওঠে। এরপর তারা নিজেদের সভ্যতা, রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থাকে দুনিয়ার উন্নতি অগ্রগতির একমাত্র চাবিকাঠি বলে প্রচার করতে শুরু করে।
তাদের এসব প্রচার প্রচারণায় অনেক মুসলিমও প্রভাবিত হন। পশ্চিমাদের ক্ষমতা আধিপত্য ও ভোগ বিলাস দেখে তারা ভাবতে শুরু করেন, এটাই বুঝি প্রকৃত সফলতা। আমরা যদি তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করি তাহলে আমরাও এভাবে সফল হবো।
এইলোকগুলো আবার দুই দলে বিভক্ত- একদল সরাসরি পশ্চিমের অনুগত দাস হিসেবে পশ্চিমে যা কিছু আছে সব কিছুকেই উন্নতি অগ্রগতির মাপকাঠি মনে করে। এছাড়া অন্যসব কিছুকে পিছিয়ে পড়া ও মধ্যযুগে ফিরে যাওয়া মনে করা। বর্তমানে অধিকাংশ মুসলিম দেশে এই অংশটা ক্ষমতায় আছে। এরা পশ্চিমের গণতন্ত্র, সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা, অবাধ যৌনাচার সহ বিভিন্ন ধরণের অন্যায় অশ্লীলতাকে মুসলিম সমাজে প্রবেশ করিয়েছে এবং প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আরেকদল সরাসরি অনুগত দাস না হলেও পশ্চিম দ্বারা প্রভাবিত। তারা পশ্চিমের বিভিন্ন নীতি ও ব্যবস্থাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে। তবে সরাসরি নয়, একটু ইসলামী ফ্লেভার লাগিয়েছে। দলীল বিকৃত করে বিভিন্ন মডারেট মতাদর্শ গ্রহণ ও প্রচার করছে। ইসলামী সেক্যুলারিজম, ইসলামী গণতন্ত্র, ইসলামী নারীবাদ, হালাল মিউজিক, হীলাভিত্তিক সুদ, হিজাব পরে সব করা যায় ইত্যাদি মতবাদের ধারক বাহক এই লোকগুলো। এরা সুকৌশলে মুসলিম সমাজে অনেক ক্ষতিকর ভাইরাস ঢুকিয়ে দিয়েছে।-বর্তমানে আমরা পশ্চিম নিয়ন্ত্রিত এক ক্যান্সারাক্রান্ত বিশ্বে বাস করছি। এই বিশ্ব ন্যায়কে অন্যায় মনে করে আর অন্যায়কে মনে করে ন্যায়। এখানে দখলদাররা শান্তিকামী আর ভূমিপূত্র প্রতিরোধকারীরা স/ন্ত্রা/সী। এখানে অশ্লীলতা ও অবাধ যৌনাচার হল সভ্যতা আর পারিবারিক ব্যবস্থার মধ্যে সুস্থ ও শালীনভাবে জীবন যাপন করা হল মধ্যযুগে ফিরে যাওয়া। এখানে অন্যায়ভাবে বিশাল সম্পদের মালিক হতে পারা সফলতা আর ন্যায়ের পথে থেকে দরিদ্র থাকা ব্যর্থতা। এই ক্যান্সারাক্রান্ত বিশ্বব্যবস্থাকে আমাদের ভাঙতে হবে। মানুষকে প্রকৃত মুক্তির পথ দেখাতে হবে। মানুষকে শয়তান ও তার অনুগতদের দাসত্ব থেকে বের করে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে নিয়ে আসতে হবে। দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে বের করে আখিরাতের প্রশস্ততার পথ দেখাতে হবে।