লিটল সেন্ট জেমস (Little Saint James)
লিটল সেন্ট জেমস হলো মার্কিন ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের (US Virgin Islands) একটি ছোট ব্যক্তিগত দ্বীপ। এটি বিশ্বজুড়ে কুখ্যাতি অর্জন করেছে এর প্রাক্তন মালিক, দোষী সাব্যস্ত যৌন অপরাধী এবং ধনাঢ্য মার্কিন অর্থদাতা জেফ্রি এপস্টাইন (Jeffrey Epstein)-এর কারণে। স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এটিকে প্রায়শই "পাপের দ্বীপ" বা "পেডোফাইল আইল্যান্ড" হিসেবে অভিহিত করা হয়।
- অবস্থান: সেন্ট টমাস দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্বে, মার্কিন ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ।
- আয়তন: আনুমানিক ৭০-৭৫ একর।
- প্রাক্তন মালিক: জেফ্রি এপস্টাইন (১৯৯৮-২০১৯)।
- বর্তমান অবস্থা: ২০২৩ সালে এসডি ইনভেস্টমেন্টস (SD Investments) এটি কিনে নেয়।
১. ভৌগোলিক অবস্থান ও ইতিহাস
ক্যারিবিয়ান সাগরের বুকে অবস্থিত এই দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। ১৯৯৮ সালে জেফ্রি এপস্টাইন এটি ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট আর্চ কামিংস-এর কাছ থেকে মাত্র ৭.৯৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে কিনেছিলেন। কেনার সময় দ্বীপটি ছিল অনেকটাই নির্জন, কিন্তু এপস্টাইন পরবর্তীতে কোটি কোটি ডলার খরচ করে এটিকে একটি বিলাসবহুল দুর্গে রূপান্তর করেন।
২. দ্বীপের বিতর্কিত স্থাপনাসমূহ
এপস্টাইন এই দ্বীপে বেশ কিছু অদ্ভুত এবং বিলাসবহুল স্থাপনা তৈরি করেছিলেন, যা নিয়ে নানা রহস্য রয়েছে:
| স্থাপনা | বিবরণ |
|---|---|
| প্রধান বাসভবন (Main Compound) | পাথর দিয়ে তৈরি বিশাল ভিলা, যেখানে একাধিক গেস্ট রুম, পুল এবং চাকর-বাকরদের থাকার জায়গা ছিল। |
| নীল মন্দির (The Temple) | দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত একটি অদ্ভুত নীল-সাদা ডোরাকাটা ভবন। এর মাথায় একটি সোনালী গম্বুজ ছিল (যা পরে ঝড়ে উড়ে যায়)। অনেকেই সন্দেহ করেন এর নিচে গোপন সুড়ঙ্গ বা কক্ষ ছিল। |
| অন্যান্য | হেলিপ্যাড, বোট ডক, সিনেমা থিয়েটার, বিশাল লাইব্রেরি এবং জাপানি বাথহাউস। |
৩. কেলেঙ্কারি ও অপরাধের কেন্দ্রবিন্দু
লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপটি এপস্টাইনের আন্তর্জাতিক যৌন পাচার চক্রের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। অভিযোগ ও তদন্ত অনুযায়ী:
- এখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিয়ে আসা হতো।
- ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স অ্যান্ড্রু, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এই দ্বীপে যাতায়াতের অভিযোগ রয়েছে (যদিও তারা কোনো অপরাধমূলক কাজের সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন)।
- দ্বীপের কর্মীরা জানিয়েছেন, এখানে সব সময় কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখা হতো।
৪. বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ
২০১৯ সালে জেফ্রি এপস্টাইনের মৃত্যুর পর দ্বীপটি দীর্ঘদিন আইনি জটিলতায় আটকে ছিল। ২০২২ সালে এটি বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়।
মে ২০২৩ সালে, বিলিয়নেয়ার বিনিয়োগকারী স্টিফেন ডেকফ (Stephen Deckoff) তার ফার্ম 'SD Investments'-এর মাধ্যমে লিটল সেন্ট জেমস এবং এর পার্শ্ববর্তী গ্রেট সেন্ট জেমস দ্বীপটি মোট ৬০ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেন।
নতুন মালিকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দ্বীপের অন্ধকার ইতিহাস মুছে ফেলার জন্য এখানে একটি বিশ্বমানের ২৫-রুমের লাক্সারি রিসোর্ট তৈরি করা হবে, যা ২০২৫ সাল নাগাদ চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট LIVE
লিটল সেন্ট জেমস: কলঙ্কিত অতীত থেকে বিলাসবহুল ভবিষ্যৎ
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন আদালত জেফ্রি এপস্টাইনের মামলার হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথি উন্মুক্ত করে। এই নথিতে লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপ সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
- নতুন নাম: নথিতে জাদুকর ডেভিড কপারফিল্ড থেকে শুরু করে প্রাক্তন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর-এর নামও উল্লেখ করা হয়েছে (তবে তারা অপরাধে জড়িত ছিলেন এমন প্রমাণ নেই)।
- স্টিফেন হকিং-এর বিতর্ক: নথিতে দেখা যায়, এপস্টাইন একটি ইমেইলে লিখেছিলেন যে, বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এই দ্বীপে "অপ্রাপ্তবয়স্কদের ম্যাসাজ পার্টিতে" অংশ নিয়েছিলেন—এমন অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন।
দ্বীপটির নতুন মালিক স্টিফেন ডেকফ ঘোষণা করেছেন যে, তিনি দ্বীপের অতীত সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে চান। বর্তমানে দ্বীপে ব্যাপক নির্মাণকাজ চলছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এখানে ২৫টি আল্ট্রা-লাক্সারি ভিলা তৈরি হচ্ছে। এপস্টাইনের তৈরি করা অনেক অদ্ভুত স্থাপত্য ভেঙে ফেলা হয়েছে বা সংস্কার করা হয়েছে।
দ্বীপের সবচেয়ে আলোচিত স্থাপনা ছিল নীল-সাদা ডোরাকাটা 'মন্দির'। ড্রোন ফুটেজ এবং স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে, মন্দিরের সেই সোনালী গম্বুজটি আর নেই।
শোনা যায়, ২০১৯ সালে হারিকেন মারিয়ার আঘাতে গম্বুজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, পরে সেটিকে পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। নতুন রিসোর্ট পরিকল্পনায় এই স্থানটিকে একটি সাধারণ মিউজিক প্যাভিলিয়ন বা ধ্যান কেন্দ্রে রূপান্তর করার কথা রয়েছে।